মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

সুন্দরবনের চিত্র

ভূমিকাঃ

সুন্দরবন বিশ্বের একক বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন। এ বন ভারত এবং বাংলাদেশ জুড়ে বিস্তৃত। প্রায় ১০,০০০ বর্গ কিলোমিআর জুড়ে বিস্তৃত সুন্দরবনের দু’তৃতীয়াংশ এলাকা বাংলাদেশে অবস্থিত। দেশের মোট সংরক্ষিত বন ভূমির প্রায় ৪৯.১% এলাকা জুড়ে অবস্থিত বাংলাদেশের সুন্দরবন (বন বিভাগ নিয়ন্ত্রিত মোট বন ভূমির প্রায় ৩২%)। বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে বিশেষ ভৌগলিক পরিবেশে অনুপম অদ্বিতীয় এ সুন্দরবন গড়ে উঠেছে। বাংলাদেশের দক্ষিণ- পশ্চিমাঞ্চলে অবস্থিত আমাদের সুন্দরবন অপূর্ব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, সম্পদ এবং জীব বৈচিত্র্যে সমৃদ্ধশালী হওয়ায় ইতিমধ্যে আমতর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এছাড়া বৈজ্ঞানিক, নৃতত্ব ও প্রত্নতাত্ত্বিক বিবেচনায় সুন্দরবন খুবই গুরুত্বপূর্ন।

 

নামকরণঃ

সুন্দরবনের প্রধান উদ্ভিদ প্রজাতি সুন্দরী। সম্ভবতঃ এই সুন্দরী গাছের নাম অনুসারে বনের নাম হয়েছে সুন্দরবন। আবার সমুদ্রের নিকটে অবস্থিত বিধায় সমুন্দর শব্দ হতে প্রথমে ""সমুন্দবন’’ ও পরে ""সুন্দরবন’’ এ নামের উৎপত্তি হয়েছে বলে অনেকে মনে করেন।

 

ইতিহাসঃ

 

অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে সুন্দরবনের আয়তন বর্তমানের প্রায় দ্বিগুন ছিল এবং জমিদারদের নিয়ন্ত্রাধীন ছিল। ১৮২৮ সালে বৃটিশ সরকার সর্বপ্রথত সুন্দবনের স্বত্ত্বাধিকার অর্জন করেন। ১৮৭৮ সালে সুন্দরবনকে সংরক্ষিত বন হিসাবে ঘোষনা দেওয়া হয় এবং ১৮৭৯ সালে সুন্দরবনের দায় দায়িত্ব বন বিভাগের উপর ন্যস্ত করা হয়।

 

আয়তনঃ

সুন্দরবনের আয়তন ৬০১৭ বর্গ কি:মি। সাতÿীরা জেলার অমত্মর্গত শ্যামনগর উপজেলার সুন্দরবনের আয়তন ১৮৬৭.৩১বর্গ কি:মি:। সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর পরিসংখ্যান বন্যপ্রাণী সংখ্যা বাঘ ৪৪০-৫০০ হরিণ ১,০০,০০০-১,৫০,০০০ ঊানর ৪০,০০০-৫০,০০০ বন্য শুকর ২০,০০০-২৫,০০০ কুমির ১৫০-২০০ উদ্ বিড়াল ২০,০০০-২৫,০০০

 

সুন্দরবনের বাঘঃ

বাঘ শুমারী, ২০০৪ হতে দেখা যায় সুন্দরবনে মোট ৪৪০ টি বাঘ আছে, যার মধ্যে ২১ টি ব্যাঘ্র শাবক রয়েছে। গড়ে সুন্দরবনে প্রতিটি বাঘের জন্য ১৪.৪ বর্গ কি.মি. ব্যাপী নিজস্ব আবাসস্থল (হোম রেঞ্জ) রয়েছে। সুন্দরবনে বাঘের উপর গবেষনার অংশ হিসাবে ২ টি বাঘিনী (যাদের নাম জামতলার রাণী এবং ছাপড়াখালীর রাণী) এর গলায় রেডিও কলার পড়ানো হয় এবং তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হয়। গবেষণায় দেখা যায় উভয় বাঘিনীরই হোম রেঞ্জ প্রায় ১৪ হতে গড়ে ১৬ বর্গ কি.মি. যা বিশ্বের অন্যান্য বনাঞ্চলের বাঘের হোম রেঞ্জ এর তুলনায় সবচেয়ে কম। এই গবেষণার পূর্বে বাঘের সবচেয়ে কম হোম রেঞ্জ পাওয়া যায় নেপালে, যা প্রায় ২৫ হতে ৩০ বর্গ কি.মি. এবং সবচেয়ে বড় হোম রেঞ্জ পাওয়া যায় রাশিয়াতে, যা ৪০০ বর্গ কি.মি. এর অধিক। গবেষণার এ ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা যায় সুন্দরবনেই বাঘের ঘনত্ব সবচেয়ে বেশী যা সুন্দরবনে বাঘের প্রজনন বৃদ্ধি এবং টেকসই বিচরণ ক্ষেত্রের উপযুক্ততা প্রমাণ করে। ২০০৪ সালে ইউ এন ডি পি এর অর্থায়নে সম্পাদিত বাঘ শুমারীর চিত্র ঃ বিভাগ রেঞ্জের নাম পুরুষ বাঘ স্ত্রী বাঘ অনুপাত বাচ্চা মোট সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ, খুলনা খুলনা ৫৪ ৯৩ ১:১.৭ ৬ ১৫৩ সাতক্ষীরা ৩৫ ৭৭ ১:২.২ ৬ ১১৮ গুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ, বাগেরহাট চাঁদপাই ১৮ ৭৯ ১:৪.৪ ৩ ১০০ শরণখোল ১৪ ৪৯ ১:৩.৫ ৬ ৬৯ মোট ১২১ ২৯৮ ১:২.৫ ২১ ৪৪০

 

সুন্দরবনের প্রধান প্রধান উদ্ভিদসমূহ:

 

সুন্দরী বৈজ্ঞানিক নামঃ Heritiera fomes. সুন্দরী সুন্দরবনের প্রধান ও সর্বোৎকৃষ্ট মানের বৃÿ প্রজাতি। বনের ৫১.৭০% এলাকা জুড়েই রয়েছে সুন্দরী গাছের প্রধান্য। ১৫-১৭ মিটার উচ্চতার এই বৃÿÿর কাঠ অত্যমত্ম টেকসই, মজবুত ও ভারী। গাড়ীর বডি, সাঁকো, নৌকা আসবাবপত্র, ঘরের খুঁটি, বৈদ্যুতিক পিলার প্রভৃতি তৈরীতে ব্যবহৃত সুন্দরী বৃÿ জ্বালানী হিসেবেও উত্তম। প্রাপ্তিস্থান: সুন্দরী বৃক্ষ সুন্দরবনের পূবাঞ্চল এ অর্থাৎ সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ, বাগেরহাট জেলার শরনখোলা রেঞ্জ, চাঁদপাই রেঞ্জ এবং সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগ এর খুলনা রেঞ্জ। তবে সাতক্ষীরা রেঞ্জেও কিছু কিছু জায়গায় সুন্দরী বৃক্ষ পাওয়া যায়। সুন্দরী (Heritiera fomes)

 

পশুর বৈজ্ঞানিক নামঃ (Xylocarpus mecongensis). বনের অন্যতম মূল্যবান বৃÿ হলো পশুর। বনের অধিক লোনা অঞ্চলে নদী-খালের তীরে এর বিসত্মৃতি। এই বৃÿÿর কাঠ মূল্যবান আসবাবপত্র, কড়ি-বরগা, পাটাতন, নৌকা প্রভৃতি তৈরীতে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে এই গাছ কাটা সম্পূর্ণ নিষেধ। মাটির নিচে শত বছরেও নষ্ট হয় না পশুর কাঠ। বনের জীবাশ্ম হিসেবে তাই এর গুরম্নত্ব অনেক। প্রাপ্তিস্থান: পশুর গাছ সুন্দরবনের অভ্যমত্মরে প্রায় সব জায়গাতে পাওয়া যায়। তবে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জে পশুর গাছ ব্যপকহাওে পাওয়া যায়।

 

গেওয়া বৈজ্ঞানিক নামঃ (Excoecaria agallocha). সুন্দরবনের সর্বাধিক বর্ধনশীল বৃÿ গেওয়া। বনের প্রায় ১৬% এলাকা জুড়ে এই বৃÿÿর বিসত্মৃতি। এই গাছ সর্বোচ্চ ১৩ মিটার উঁচু হয়ে থাকে। এর কান্ড ও কাঠ বেশ নরম। গেওয়ার প্রধান ব্যবহার ছিল খুলনা নিউজপ্রিন্ট মিলের কাঁচামাল হিসেবে। সম্প্রতি বন সংরÿণার্থে প্রণীত নীতিমালা অনুযায়ী এর ব্যবহার ব্যবহার ব্যাপকভাবে কমানো হয়েছে। প্যাকিং বক্স, দিয়াশলাই, খুঁটি, পেন্সিল, ঢোল, তবলা ও খেলনা নির্মাণেও গেওয়ার যথেষ্ট ব্যবহার রয়েছে। এর বাকল জ্বালানী হিসেবে সমাদৃত। গেওয়া ফুল মধুর প্রধান উৎস। এর কচিপাতা ও ফল হরিণের খাদ্য। গেওয়ার সাদা রংয়ের আঠা অত্যমত্ম বিষাক্ত। মানুষের চোখে লাগলে দৃষ্টি শক্তি নষ্ট হয়। প্রাপ্তিস্থান: গেওয়া গাছ সুন্দরবনের প্রায় সব জায়গাতে পাওয়া যায়। তবে সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জে গেওয়া গাছ ব্যপকহাওে পাওয়া যায়।

 

গরাণঃ বৈজ্ঞানিক নামঃ (Ceriops decandra). গরাণ ঝোপ জাতীয় উদ্ভিদ। এই কাঠ অন্যতম সেরা জ্বালানী হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মাঝারী উচ্চতার (৩-৫ মিটার) অত্যমত্ম শক্ত লালচে বর্ণের গরাণ ঘরের খুঁটি, রম্নয়া, বাতা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। বনের প্রায় সর্বত্রই কম-বেশি গরাণ দেখা যায়। আর লুকাবার স্থান হিসেবে বাঘের পছন্দ এই গরাণ ঝোপ। ঔষধি গুণ সম্পন্ন এই গরাণের ছালের কষ রং তৈরী, জাল রং করা ও চামড়া ট্যান করার কাজে ব্যবহৃত হয়। পোড়া গরাণ কয়লা হিসেবেও ব্যবহৃত হয়। সুন্দরবনের অন্যতম অর্থকরী উদ্ভিদ গরাণ। সিডর পরবর্তী সুন্দরবন হইতে গরাণ আহরণ বন্ধ আছে। প্রাপ্তিস্থান: গরাণ সুন্দরবনের অভ্যমত্মরে প্রায় সব জায়গাতে পাওয়া যায়। তবে সাগর পাড়ের এলাকাতে বেশী পরিমানে গরাণ বেশী জন্মে। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জে গরাণ ব্যপকহাওে পাওয়া যায়।

 

কেওড়াঃ বৈজ্ঞানিক নাম ঃ (Sonneratia apetala). সুন্দরবনের অন্যতম বৃহদাকার ও সৌন্দর্যমন্ডিত বৃÿ প্রজাতি এই কেওড়া। সাধারণত বনের নদী তীরে ও চরে এর ব্যাপক দেখা মেলে এবং বনের অমত্মত ১৫টি কম্পার্টমেন্টে এর আধিক্য পরিলÿÿত হয়। হরিণের সবচেয়ে প্রিয় খাবার কেওড়ার টক স্বাদের ফল ও পাতা। খুব শক্ত না হলেও এর কাঠের ব্যবহার যথেষ্ট দেখা যায়। কাঠের ঘর, জানালা-দরজার পালস্না, খুঁটি তৈরীতে কেওড়া কাঠ ব্যবহৃত হয়। প্রাপ্তিস্থান: নতুন জেগে উঠা চরে বিশেষ করিয়া নদী ও খালের পাড়ে কেওড়া গাছ বেশী জন্মে। কেওড়া গাছ সুন্দরবনের অভ্যমত্মরে প্রায় সব জায়গাতে পাওয়া যায়।

 

ধুন্দুলঃ বৈজ্ঞানিক নাম ঃ (Xylocarpus granatum). সুন্দরবনের অন্যতম মুল্যবান বৃÿ ধুন্দুল। শক্ত, ভারী, টেকসই কাঠের জন্য এ বৃÿÿর চাহিদা ছিল ব্যাপক। কিন্তু এখন সচরাচর এর দেখা মেলে না বনের যত্রতত্র। সুন্দরবনের সবচেয়ে বড় আকারের ফল জন্মে এ বৃÿÿ। এর ওজন আধা কেজি থেকে পাঁচ কেজি পর্যমত্ম হয়ে থাকে। সোফা, শোকেস, আলনাসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র তৈরির জন্য ধুন্দুল কাঠ উত্তম। প্রাপ্তিস্থান: ধুন্দুল গাছ সুন্দরবনের পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জে বেশী পাওয়া যায়। তবে সুন্দরনের অন্যান্য জায়গায় ও ধুন্দল গাছ পাওয়া যায়।

 

খলসিঃ বৈজ্ঞানিক নামঃ (Aegiceras corniculatum). ‘‘হানিপস্নান্ট’’ হিসেবে খলসি গাছের বেশ কদর সুন্দরবনে। গুল্ম জাতীয় এই বৃÿÿ মার্চ-এপ্রিলে যখন ফুলে ফুলে ভরে ওঠে মৌমাছিরা তখন সেই ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করে গাছে গাছে চাক বাঁধে। সুন্দরবনের খলসি মধু বিখ্যাত ও উন্নতমানের। জ্বালানী সহ বিভিন্ন কাজে খলসি ব্যবহৃত হয়। প্রাপ্তিস্থান: খলসি গাছ সুন্দরবনের পশ্চিম বন বিভাগের সাতক্ষীরা রেঞ্জে বেশী পাওয়া যায়। খলসি ফুলের মধু বিখ্যাত ও সুসাধু । তাই সাতক্ষীরা রেঞ্জের খলসী মধুর খুব কদর রহিয়াছে।